সমুদ্রে জীবন – ৪

mariner77_1277921701_3-MVC-320Eএই সিরিজের আগের লেখাটায়, বিভিন্ন ধরনের জাহাজের কিছু বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যাতে (অ-জাহাজী) সাধারণ পাঠকরা যদি সিরিজটা পড়তে থাকেন, তবে মোটামুটিভাবে যেন বোঝেন যে, কি নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। আগের লেখায় জাহাজের শ্রেণীবিভাগটা ছিল মালামালের ধরনের উপর ভিত্তি করে। এবার ট্রেডিং/সার্ভিস বা ব্যবসার ধরনের উপর নির্ভর করে জাহাজের আরেকটি শ্রেণীবিভাগের কথা বলবো। সেটা হচ্ছে liner ও tramping। যে জাহাজগুলো নির্দিষ্ট সময় পর পর একই পোর্টগুলোতে ঘুরে ঘুরে আসে – সেই জাহাজগুলোকে liner vessel বলে। (প্যাসেঞ্জার লাইনার এবং ইনটারন্যাশনাল ফেরী ছাড়া) সাধারণত বড় কন্টেইনার জাহাজগুলো, কার ক্যারিয়ার ও Ro Ro Vessels ইত্যাদি লাইনার সার্ভিসে নিয়োজিত থাকে – আগে “জেনারেল কার্গো” জাহাজ দিয়েও কোথাও কোথাও liner সার্ভিস চালু থাকলেও, এখন তা নেই বললেই চলে! কোথাও কোথাও রেফ্রিজারেটেড শিপগুলোও লাইনার সার্ভিসে নিয়োজিত থাকতে পারে। যে জাহাজগুলো tramping করে, সে গুলোর কোন নির্দিস্ট রুট নেই (tramp কথাটার মানে ভবঘুরে বা যাযাবর – সেই হিসেবে নামটা যথার্থ)। বাল্ক ক্যারিয়ার, জেনারেল কার্গো বা লগ ক্যারিয়ার – এগুলো সাধারণত tramping করে থাকে।

Liner জাহাজগুলোর যেহেতু অবশ্যই সময় মেনে চলার একটা বাধ্যবাধকতা থাকবে, তাই ওগুলো দ্রতগতিসম্পন্ন, শক্তিশালী ও দামী ইন্জিন সম্বলিত হয়ে থাকে। মোটকথা এগুলো দামী ও ব্যয়বহুল জাহাজ হবে। ধরুন একটা লাইনার জাহাজ আজ তার V05 (বা ৫ নম্বর ভয়েজে) Singapore call করলো । এর পর, say, তার V08 (বা ৮ নম্বর ভয়েজে)-এ সে কবে কত তারিখে কতটার সময় Singapore-এ থাকবে – তা এখন থেকেই জানা থাকবে। এখানে সময় maintain করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর বিপরীতে tramping জাহাজগুলোর ব্যাপার ঠিক উল্টো। অনেক সময় একটা বন্দরে মাল খালাস করার পর, কোন definite assignment না থাকায় কোম্পানী থেকে একটা vague direction দিয়ে হয়তো বলা হবে যে, এদিকে যেতে থাকো। সুতরাং খালি জাহাজ নিয়ে আমরা সে দিকে যাবো, আর জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকবে: পরবর্তী বন্দরটা কি হতে পারে?! তারপর একটা আকাঙ্খিত অথচ অপ্রত্যাশিত বন্দরের নাম শুনলে হৃদপিন্ডটা হঠাৎ লাফিয়ে উঠবে – এটা একটা unique experience – অন্য কাউকে বোঝানো মুশকিল! আমার জীবনের একটা ঘটনা বলি:

একবার আমরা একটা ৭৮,০০০ টনের bulk carrier-এ খনিজ পদার্থ নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে ইটালী গেলাম। ইটালিতে মাল খালাসের পর আমাদের কোন definite assignment না থাকায়, কোম্পানী আমাদের বললো Gulf of Mexico-এর দিকে এগুতে। পথে হঠাৎ বললো Venezuela-র Maracaibo-তে গিয়ে France-এর Dunkirk-এর জন্য মাল লোড করতে। ব্যাপারটা আমার জন্য খুবই উত্তেজনাকর ছিল – কারণ তখনো পযর্ন্ত আমি দক্ষিণ আমেরিকার কোন বন্দরে যাই নি! আর ফ্রান্সেরও কেবল একটি কন্টেইনার পোর্ট Le Havre-এ গিয়েছিলাম এর আগে। সুতরাং, ভয়েজের নির্ধারিত রুট জেনে খুবই খুশী লাগছিল! প্রসঙ্গত বলে নিই – বড় হলেও, কন্টেইনার জাহাজগুলোর বন্দরে অবস্থান সাধারণত ঘন্টায় হিসাব করা হয়, অথচ bulk carrier-গুলো প্রায়ই discharge port-এ দিনের পর দিন থাকে – কোন একটা নতুন জায়গা দেখার জন্য বা ঘুরে বেড়ানোর জন্য ব্যাপারটা খুবই আদর্শ! আগে যেমন বললাম যে, এই ঘটনার আগেও আমি (কয়েকবার)France-এ গিয়েছিলাম, Le Havre-এ – কিন্তু প্রতিবারই বন্দরে থাকা হয়েছে মাত্র ১৮ থেকে ২৪ ঘন্টার মত! কিন্তু Venezuela থেকে কার্গো নিয়ে যখন France-এর Dunkirk-এ আসি, তখন সেখানে প্রায় সপ্তাহখানেক থাকি! অনেক সময় load port-এ bulk carrier-গুলো খুব কম সময় থাকে – যেমন উপরে উল্লিখিত আমার অস্ট্রেলিয়া-ইটালী ভয়েজে, আমরা আস্ট্রেলিয়ায় ছিলাম মাত্র ১ দিন – আর ইটালিতে ছিলাম ১ সপ্তাহেরও বেশী!

একজন নাবিকের কাছে কোন ধরনের সার্ভিসে নিয়োজিত থাকা পছন্দনীয় হবে – এটা নির্ভর করবে তার প্রকৃতির উপর। Liner জাহাজে অজানা, অচেনা বা ছোট জায়গায় যাবার সম্ভাবনা কম। সব কিছুই আগে থেকে জানা – হিসাব করা। আমি যা বুঝি, জীবনে যারা disciplined, calculative, pragmatic – তাদের কাছে Liner জাহাজ ভালো লাগার কথা। আর আমার মত যারা অলস, যারা জীবনের অনিশ্চয়তাকে উপভোগ করে এবং impractical – তাদের কাছে tramp জাহাজগুলো ভালো লাগার কথা। আর একটা কথা – কে কোন জাহাজে যাবে, এ ব্যাপারে নিজস্ব মতামতের খুব বেশী scope নাই – তবে অভিজ্ঞতা ও সার্টিফিকেশন একটা ফ্যাক্টর হয়। আমি যেমন ট্যাঙ্কারে কাজ করি নি এবং “ট্যাঙ্কারের বিশেষ নিরাপত্তা” কোর্সগুলো করি নি – তাই এখন কিছুতেই ট্যাঙ্কারে হঠাৎ করে আমার rank-এ যোগ দেয়াটা সম্ভব হবে না! যদি একান্ত যেতেই চাই, তবে নীচের rank-এ কোন একটা ট্যাঙ্কারে যোগ দিয়ে, একটা নির্দিষ্ট সময় কাটিয়ে তারপর “ট্যাঙ্কারের বিশেষ নিরাপত্তা কোর্সগুলো” করে নিতে হবে। তবে হয়তো নিজেকে ট্যাঙ্কার বহরে যুক্ত করা যাবে!

সবশেষে, এর আগের পোস্টগুলোতে যে কন্টেইনার জাহাজটির কিছু ছবি দিয়েছিলাম – সেই জাহাজটি সম্বন্ধে কিছু কথা বলে শেষ করবো। আমি যখন ঐ জাহাজে ছিলাম তখন জাহাজটি ৫৬ দিনের একটা loop-এ লাইনার সার্ভিসে নিয়োজিত ছিল। সাধারণত লাইনার জাহাজের একটা loop বা “রাউন্ড-ভয়েজের” মোট “দিন সংখ্যা” ৭ এর multiple হয় – যাতে, যে সকল বন্দরে সে যায় – তার প্রতিটিতে সপ্তাহের একটা নির্দিস্ট বারে সে উপস্থিত থাকতে পারে। কথার কথা, যদি সে জার্মানীর হামবুর্গে প্রথমবার রবিবারে গিয়ে থাকে, তবে ঐ লাইনে সে যতদিন থাকবে, ততদিন ৫৬ দিন পর পর একটা রবিবারেই সে জার্মানীর হামবুর্গে উপস্থিত হবে! আমার ঐ জাহজের loop-টা ছিল এমন:
জাপান – – দঃ কোরিয়া (Pusan) – – তাইওয়ান (Kaohsiung) – – হং কং – – সিঙ্গাপুর – – সুয়েজ খাল – – হল্যান্ড (Rotterdam) – – জার্মানী(Hamburg) – – ইংল্যান্ড(Felixstowe) – – ফ্রান্স (Le Havre) – – সুয়েজ খাল – – সিঙ্গাপুর – – হং কং – – জাপান
দূর প্রাচ্যের দিকে কখনো এক আধটা পোর্ট বাড়তো বা কমতো – যেমন কখনো আসা-যাওয়া দুই পথেই তাইওয়ান ছুঁয়ে যেতে হতো! আমরা জ্বালানী ও খাবার নিতাম সাধারণত সিঙ্গাপুরে ও হল্যান্ডে। প্রতিবার হল্যান্ডে আমরা ৫০০০ টনের মত Heavy Fuel Oil নিতাম – যেটা ঐ জাহাজের মূল জ্বালানী। এছাড়া প্রতিবার সিঙ্গাপুরে প্রয়োজনমত টপ-আপ করা হতো। জাহাজটিতে ঐ জ্বালানীর প্রায় ৭০০০ টন নেবার মত ট্যাঙ্ক-ক্যাপাসিটি ছিল। এছাড়া বিশেষ ব্যবহারের জন্য Diesel Oil নেয়া হতো – সাধারণত ১০০-২০০ টনের মত Diesel Oil জাহাজে রিজার্ভ থাকতো!

জাহাজের খাবার বা provision নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে সাধারণের মাঝে। খাবার বা provision কিছু নির্দিষ্ট বন্দর থেকে নেয়া হয়। dry provision – যেমন চাল, ডাল, মসলা, কফি, চিনি ইত্যাদি বেশী করে বেশ কিছুদিনের জন্য একবারে নেয়া হয় এবং সেগুলো dry provision locker বলে একটা ঘরে রাখা হয়। কাঁচা-বাজার বা মাছ, মাংস সবজী ইত্যাদি স্বল্প সময়ের জন্য নেয়ার চেষ্টা করা হয়, যাতে বেশী দিনের পুরানো frozen food stuff না খেতে না হয়। তবু, না না অসুবিধার জন্য ও expensive হয়ে যায় বলে কাঁচা-বাজার বেশী ঘন ঘনও নেয়া যায় না। উপরে আমি যে জাহাজটার গল্প বললাম, সেটার provision একটা রাউন্ড ভয়েজে ৩ বার নেয়া হতো – ২ বার সিঙ্গাপুরে আর একবার হল্যান্ডে। জাহাজে Meat room, Fish room ও Vegetable room বলে তিনটা refrigerated chamber/room থাকে, যার সাথে একটা handling space থাকে! এই ঘরগুলো একেকটা আনুমানিক ২০০ বর্গফুট আয়তনের হয়।

এই জাহাজে একটা ৮ stop লিফট বা elevator ছিল, জাহাজের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ওঠানামার নামার জন্য। Elevator-এর আওতার উপরে ছিল Navigational Bridge – আর এর আওতার নীচে ইন্জিনরূমে ছিল আরো তিনটা ফ্লোর – সেই হিসাবে জাহাজটাকে ১২তলা ভাবা যায়।

বাকী রইলো ঐ জাহাজের, বা যে কোন জাহজের, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীময় পানির ভিতর থাকলেও, পানির সরবরাহ ও পর্যাপ্ততা জাহাজে constant tension-এর একটা ব্যাপার। আজকালকার জাহাজগুলোর টয়লেটের ফ্লাশ থেকে শুরু করে কাপড় ধোয়া, গোসল করা ইত্যাদির জন্য মিঠা পানির অপরিহার্যতা যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি বড় জাহাজগুলো ইন্জিন ও বয়লারে বেশ কিছু মিঠা পানি “টপ-আপ” করতে হয় – আর পানীয় জলের ব্যাপার তো আছেই। যে জাহাজটির বর্ণনা দিলাম, তাতে গড়ে প্রতিদিন ২০ টন পানি তো লাগতোই – কখনো কোন ইন্জিন মেইনট্যানেন্স থাকলে হয়তো সেই ব্যবহৃত পানির পরিমাণ ৩০ টনে গিয়েও দাঁড়াতো! সমুদ্রে যখন জাহাজ চলে, তখন এই পানি জাহাজে নিখরচায় বানানো যায়/হয়। জাহাজের মেইন ইন্জিন চলার সময় যে heat generated হয়, সেটা ঠান্ডা করার জন্য cooling fresh water circulate করা হয়। ঐ cooling water দিয়ে সমুদ্রের নোনা পানির evaporation ও condensation-এর মাধ্যমে distilled water বানানো হয় – আমরা যে জাহাজটির ছবি দেখেছি/দেখছি – ঐ জাহাজটি দিনে ৩০ টন পানি তৈরী করতো। এই পানি অন্য সব কাজের জন্য উপযোগী হলেও, পানীয় জল হিসেবে ঠিক উপযোগী না। তাই বন্দর থেকে নেয়া খাবার পানি আলাদা ট্যাঙ্কে রেখে শুধু খাবার জন্য ব্যবহার করা হয়। বিশেষ প্রয়োজনে খনিজ সমৃদ্ধ ঐ পানির সাথে, জাহাজে বানানো distilled water মিশিয়ে নরয়া হতো মন্দের ভালো হিসাবে!

[এই সিরিজের আগের লেখাগুলো রয়েছে এখানে:

 

 

mariner77_1277919098_1-MVC-391S

mariner77_1277921576_2-MVC-392Sআমাদের বর্ণনার কন্টেইনার জাহাজ থেকে তোলা এই দুইটা ছবি হচ্ছে হল্যান্ডের Rotterdam সংলগ্ন ইউরোপোর্টের একটা “রোবোটিক” টার্মিনালের। ছবিতে যে যন্ত্রযান দেখা যাচ্ছে – তাতে কোন চালক নেই। একটা কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমের কম্পিউটার থেকে চালকবিহীন এই যানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে কন্টেইনার আনা-নেয়া করা হয়!

mariner77_1277921701_3-MVC-320E

আর এই ছবিটা আমার ঘরের “পোর্ট-হোল” থেকে তোলা সামনের দিকের ডেকের ছবি। ছবিতে ডেকের উপর কন্টেইনারের সর্বোচ্চ tier টা দেখা যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *